একসময় যে কাজ শেষ করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগত, এখন তা কয়েক মিনিটেই হয়ে যাচ্ছে। চিঠি লেখা, হিসাব মেলানো, তথ্য খোঁজা কিংবা ভাষা অনুবাদ, সবখানেই এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (Artificial Intelligence) মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্ন হলো, এই প্রযুক্তি আসলে মানুষের কাজ কতটা সহজ করছে?
কর্মক্ষেত্রে এআই এখন নিয়মিত সঙ্গী
এআই এখন আর ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নয়, এটি দৈনন্দিন কাজের অংশ হয়ে গেছে। মানবসম্পদ প্রতিষ্ঠান এডিপি রিসার্চের ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে জরিপে অংশ নেওয়া কর্মীদের অর্ধেকই সপ্তাহে একাধিকবার এআই ব্যবহার করছেন, আর প্রতি পাঁচজনে একজন প্রায় প্রতিদিনই এটি ব্যবহার করেন।
সময় বাঁচানোর ক্ষেত্রেও এর প্রভাব স্পষ্ট। আরেকটি জরিপে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানের মূল কাজের সফটওয়্যারে যুক্ত এআই ফিচার ব্যবহার করে ৬০ শতাংশ কর্মী তাদের কাজের সময় ২৫ শতাংশ বা তার বেশি বাঁচাতে পারছেন।
নতুনদের জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চের (এনবিইআর) একটি মাঠপর্যায়ের গবেষণায় ৫ হাজারের বেশি গ্রাহকসেবা কর্মীর কাজ পর্যবেক্ষণ করা হয়। এআই সহকারী ব্যবহারে তাদের কাজের দক্ষতা গড়ে ১৪ শতাংশ বেড়েছে, আর নতুন ও কম অভিজ্ঞ কর্মীদের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধি ছিল ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ, অভিজ্ঞদের কাছ থেকে শেখা জ্ঞান এআই-এর মাধ্যমে নতুনদের কাছে দ্রুত পৌঁছে যাচ্ছে।
যেসব ক্ষেত্রে কাজ সহজ হচ্ছে
অফিস ও ব্যবসা: ইমেইল লেখা, প্রতিবেদন তৈরি, হিসাবের খসড়া ও তথ্য বিশ্লেষণ এখন অনেক দ্রুত হচ্ছে।
স্বাস্থ্যসেবা: এক্স-রে ও বিভিন্ন পরীক্ষার ছবি বিশ্লেষণে এআই চিকিৎসকদের সহায়তা করছে, ফলে রোগ শনাক্ত দ্রুত হচ্ছে।
কৃষি: মোবাইলে ফসলের ছবি তুলে রোগ চেনা, আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানা এবং সার-সেচের পরামর্শ পাওয়া সহজ হয়েছে।
শিক্ষা: শিক্ষার্থীরা কঠিন বিষয় নিজের ভাষায় বুঝে নিতে পারছে, শিক্ষকরাও পাঠ পরিকল্পনায় সাহায্য পাচ্ছেন।
ভাষা ও যোগাযোগ: বাংলা থেকে ইংরেজি বা অন্য ভাষায় অনুবাদ এখন মুহূর্তের ব্যাপার, যা প্রবাসী ও ব্যবসায়ীদের কাজে লাগছে।
কাজের ধরন বদলাচ্ছে
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের গবেষকরা প্রায় ৭৫০ জন প্রতিষ্ঠানপ্রধানের ওপর জরিপ চালিয়েছেন। তাদের মতে, এআই-এর কারণে নিকট ভবিষ্যতে সামগ্রিকভাবে বড় ধরনের কর্মসংস্থান হ্রাসের প্রমাণ কম পাওয়া গেছে। তবে গতানুগতিক করণিক কাজের চাহিদা কমছে এবং দক্ষ কারিগরি কাজের চাহিদা বাড়ছে। এর মানে, এআই মানুষকে পুরোপুরি সরিয়ে দিচ্ছে না, বরং কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে।
সতর্কতাও জরুরি
এআই-এর অতিরিক্ত ব্যবহারও সমস্যা তৈরি করতে পারে। হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, একসঙ্গে অনেকগুলো এআই টুল ব্যবহার করা কর্মীদের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্লান্তি ও ভুল বেড়েছে। অন্যদিকে, পরিকল্পিতভাবে একঘেয়ে কাজ এআই-কে দিয়ে করালে মানসিক চাপ কমেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই-এর দেওয়া তথ্য সবসময় নির্ভুল নয়। তাই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আগে তথ্য যাচাই করা, ব্যক্তিগত তথ্য সাবধানে ব্যবহার করা এবং নিজের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি।
বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনা
বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী, ফ্রিল্যান্সার ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য এআই বড় সুযোগ তৈরি করছে। কম খরচে বিজ্ঞাপন তৈরি, অনলাইন ব্যবসার গ্রাহকসেবা কিংবা নতুন দক্ষতা শেখা এখন হাতের মুঠোয়। তবে এই সুবিধা সবার কাছে পৌঁছাতে প্রয়োজন দ্রুতগতির ইন্টারনেট, ডিজিটাল প্রশিক্ষণ এবং বাংলা ভাষায় আরও উন্নত এআই সেবা।
সব মিলিয়ে বলা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং একজন দক্ষ সহকারী। সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে এটি মানুষের সময় বাঁচায়, ভুল কমায় এবং সৃজনশীল কাজে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ করে দেয়।